ঢাকা থেকে রাজশাহী ট্রেনের সময়সূচী, ভাড়া ও অনলাইনে টিকিট কাটার সহজ নিয়ম: পূর্ণাঙ্গ গাইড!

পদ্মা পাড়ের শহর রাজশাহী, যা সিল্ক সিটি বা শিক্ষার শহর হিসেবে সারা দেশে পরিচিত। আম, রেশম আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশের টানে প্রতিবছর ঢাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ এই শহরে যাতায়াত করেন। ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার সবচেয়ে আরামদায়ক, নিরাপদ এবং জনপ্রিয় মাধ্যম হলো ট্রেন। বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে রেললাইন দিয়ে সবুজ প্রকৃতির বুক চিরে এগিয়ে চলা এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

আপনি কি প্রথমবার রাজশাহী যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন? ট্রেনের সময়সূচী জানেন না কিংবা অনলাইনে Dhaka to Rajshahi Train Ticket and Schedule কাটার ঝামেলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন? বিশেষ করে যারা টেকনিক্যাল বিষয়গুলো খুব বেশি বোঝেন না, তাদের জন্য আজকের এই ব্লগটি হবে একটি সহজ সমাধান। এই একটি ব্লগের মাধ্যমেই আপনি ট্রেনের বিস্তারিত তথ্য থেকে শুরু করে দর্শনীয় স্থান পর্যন্ত সবকিছু জানতে পারবেন।

কেন ঢাকা থেকে রাজশাহী ভ্রমণে ট্রেন বেছে নেবেন?

ঢাকা থেকে রাজশাহীর দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। বাসে এই পথ পাড়ি দিতে অনেক সময় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট হয়। কিন্তু ট্রেনে ভ্রমণের কিছু বাড়তি সুবিধা রয়েছে:

  • নিরাপদ ভ্রমণ: সড়কপথের তুলনায় রেলপথ অনেক বেশি নিরাপদ।
  • সময় সাশ্রয়: নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছানো যায়, যানজটের কোনো ভয় নেই।
  • আরামদায়ক আসন: দীর্ঘ যাত্রায় ট্রেনের ভেতরে হাঁটাচলা করা যায় এবং আরাম করে বসা যায়।
  • যমুনা সেতুর দৃশ্য: ট্রেনের জানলা দিয়ে যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতুর বিশালতা দেখা এক দারুণ অনুভূতি।

ঢাকা থেকে রাজশাহী ট্রেনের সময়সূচী ও ভাড়ার তালিকা

ঢাকা থেকে রাজশাহী রুটে বর্তমানে দুটি জনপ্রিয় আন্তঃনগর ট্রেন নিয়মিত চলাচল করে। আপনার সুবিধামতো নিচের টেবিল থেকে সময় দেখে নিন:

ঢাকা টু রাজশাহী ট্রেনের সময়সূচী

ট্রেনের নাম ট্রেন নং ঢাকা থেকে ছাড়ার সময় রাজশাহী পৌঁছানোর সময় সাপ্তাহিক ছুটি
ধুমকেতু এক্সপ্রেস ৭৬৯ সকাল ০৬:০০ মিনিট সকাল ১১:৪০ মিনিট ..........
বনলতা এক্সপ্রেস ৭৯১ দুপুর ০১:৩০ মিনিট সন্ধ্যা ০৬:০৫ মিনিট ..........
মধুমতি এক্সপ্রেস ৭৫৫ দুপুর ০৩:০০ মিনিট রাত ১০:৪০ মিনিট ..........
পদ্মা এক্সপ্রেস ৭৫৯ রাত ১০:০০ মিনিট ভোর ০৪:২৫ মিনিট ..........

রাজশাহী টু ঢাকা ট্রেনের সময়সূচী :

ট্রেনের নাম ট্রেন নং রাজশাহী থেকে ছাড়ার সময় ঢাকা পৌঁছানোর সময় সাপ্তাহিক ছুটি
ধুমকেতু এক্সপ্রেস ৭৭০ রাত ১১:২০ মিনিট ভোর ০৫:০০ মিনিট ..........
বনলতা এক্সপ্রেস ৭৯২ সকাল ০৭:০০ মিনিট সকাল ১১:৩৫ মিনিট ..........
মধুমতি এক্সপ্রেস ৭৫৬ সকাল ০৬:৪০ মিনিট দুপুর ০২:০০ মিনিট ..........
পদ্মা এক্সপ্রেস ৭৬০ বিকাল ০৪:০০ মিনিট রাত ০৯:২৫ মিনিট ..........

মনে রাখবেন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনবোধে সময় পরিবর্তন করতে পারে, তাই যাত্রার আগে অবশ্যই রেল সেবা অ্যাপ বা স্টেশনে খোঁজ নিন।

ঢাকা থেকে রাজশাহী ট্রেনের টিকিটের ভাড়া (Fare List)

আপনার বাজেট এবং পছন্দের সিটের ধরন অনুযায়ী ট্রেনের ভাড়ার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

আসন শ্রেণী ভাড়া
শোভন চেয়ার ( S-CHAIR ) ৫৮৫ টাকা
স্নিগ্ধা এসি সিট ( SNIGDHA ) ৮৫০ টাকা
এসি কেবিন বাথ ( AC-B ) ১৩৯০ টাকা
এসি কেবিন সিট ( AC ) ১০২৫ টাকা
শোভন ( SHOVAN ) ২০০/৩০০ টাকা

দ্রষ্টব্য: ভাড়ার হার যেকোনো সময় বাংলাদেশ রেলওয়ে পরিবর্তন করতে পারে।

অনলাইনে ট্রেন টিকেট কাটার নিয়ম (Dhaka to Rajshahi Train Ticket and Schedule)

ট্রেন ট্র্যাকিং পদ্ধতি

আপনার কাঙ্ক্ষিত ট্রেনটি বর্তমানে কোথায় আছে তা জানতে ট্রেন ট্র্যাকিং করা খুবই জরুরি। ট্র্যাকিং করতে আপনার ফোনের মেসেজ অপশনে গিয়ে লিখুন:
TR <Space> Train Number (যেমন: TR 813) এবং পাঠিয়ে দিন ১৬৩১৮ নাম্বারে। ফিরতি মেসেজে আপনি ট্রেনের বর্তমান অবস্থান ও সময় জানতে পারবেন।

রাজশাহী এর আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানসমূহ ( Sightseeing at Rajshahi)

রাজশাহী পৌঁছানোর পর আপনি যেসব জায়গায় ঘুরে দেখতে পারেন:

  • বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর: দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর। এখানে পাল ও সেন আমলের অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে।
  • পদ্মা গার্ডেন ও টি-বাঁধ: বিকেলে পদ্মার পাড়ে মুক্ত বাতাস আর সূর্যাস্ত দেখার জন্য এটি শহরের সেরা জায়গা।
  • পুঠিয়া রাজবাড়ি ও মন্দির চত্বর: এখানে শিব মন্দিরসহ বেশ কিছু চমৎকার প্রাচীন মন্দির রয়েছে যা পোড়ামাটির কাজ বা টেরাকোটার জন্য বিখ্যাত।
  • বাঘা মসজিদ: ১৫২৩ সালে নির্মিত এই প্রাচীন মসজিদটি বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
  • রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই বিশাল ক্যাম্পাসটি ভ্রমণপিপাসুদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে থাকে।

যাত্রীদের জন্য জরুরি কিছু টিপস

  • অগ্রিম টিকিট: ঢাকা-দিনাজপুর রুটে টিকিটের চাহিদা অনেক বেশি থাকে। তাই যাত্রার ১০ দিন আগেই টিকিট কেটে রাখা নিরাপদ।
  • আইডি কার্ড সাথে রাখুন: রেলওয়ের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, টিকিট যার নামে কাটা হয়েছে, তার এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধনের ফটোকপি বা ডিজিটাল কপি সাথে রাখা জরুরি।
  • স্টেশনে উপস্থিতি: ট্রেন ছাড়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশনে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন।
  • সতর্কতা: ট্রেনের ভেতরে জানলার পাশে বসার সময় মোবাইল বা মূল্যবান জিনিসের প্রতি খেয়াল রাখুন।

স্ট্যান্ডিং টিকিট বা আসনবিহীন টিকিট

যদি কোনো কারণে সিট টিকেট না পান, তবে ট্রেন ছাড়ার অল্প সময় আগে স্টেশন কাউন্টার থেকে স্ট্যান্ডিং টিকিট সংগ্রহ করা যায়। সাধারণত মোট আসনের ২৫% স্ট্যান্ডিং টিকিট ইস্যু করা হয়। তবে দীর্ঘ যাত্রায় দাঁড়িয়ে যাওয়াটা বেশ কষ্টসাধ্য হতে পারে।

টিকিট রিফান্ড পলিসি

  • যাত্রা শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে ফেরত দিলে সার্ভিস চার্জ বাদে বাকি টাকা পাবেন।
  • ৪৮ ঘণ্টার কম কিন্তু ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় থাকলে ২৫% টাকা কাটা হবে।
  • ২৪ ঘণ্টার কম কিন্তু ১২ ঘণ্টার বেশি সময় থাকলে ৫০% টাকা কাটা হবে।
  • ০৬ ঘণ্টার কম সময় থাকলে কোনো টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না।

রেলওয়ের প্রয়োজনীয় ফোন নাম্বার

জরুরি প্রয়োজনে নিচের নাম্বারগুলোতে যোগাযোগ করতে পারেন:

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন
ফোন: ০২-৯৩৫৮৬৩৪
মোবাইলঃ ০১৭১১৬৯১৬১২

পার্সেল ও লাগেজ বুকিং

আপনি যদি বড় কোনো মালামাল বা পার্সেল সাথে নিতে চান, তবে ট্রেনের পার্সেল ভ্যানে তা বুকিং করতে পারেন। এর জন্য আলাদা চার্জ প্রযোজ্য। প্রতিটি টিকেটের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ ওজনের লাগেজ বিনামূল্যে বহন করা যায়, তবে অতিরিক্ত ওজনের জন্য বুকিং আবশ্যক।

ঢাকা থেকে রাজশাহী ট্রেনের সময়সূচী ও টিকিট সংক্রান্ত FAQ

উত্তর: ঢাকা থেকে রাজশাহী রুটের সবচেয়ে দ্রুতগামী এবং একমাত্র নন-স্টপ ট্রেন হলো বনলতা এক্সপ্রেস (Banalata Express)। এটি যাত্রাপথে ঢাকা বিমানবন্দর ছাড়া অন্য কোনো স্টেশনে থামে না, তাই সবচেয়ে কম সময়ে (প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টায়) আরামে রাজশাহী পৌঁছানো যায়।

উত্তর: ঢাকা-রাজশাহী ট্রেনের সাধারণ শোভন চেয়ার ৩৪০ টাকা, স্নিগ্ধা ৬৫৬ টাকা, এসি সিট ৭৮২ টাকা এবং এসি বার্থ ১১৭৩ টাকা। তবে লক্ষ্য রাখবেন: বনলতা এক্সপ্রেসে বাধ্যতামূলক খাবার বিল (১৫০ টাকা) যুক্ত থাকায় এর টিকিটের দাম সাধারণ ট্রেনের চেয়ে ১৫০ টাকা বেশি হয়। (আপনার ওয়েবসাইটের আপডেটের সাথে মিলিয়ে নেবেন)।

উত্তর: ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে রাজশাহী যাওয়ার একমাত্র আন্তঃনগর ট্রেন হলো মধুমতি এক্সপ্রেস। এটি কমলাপুর থেকে ছেড়ে ভাঙ্গা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া হয়ে রাজশাহী যায়। অন্যদিকে সিল্কসিটি, পদ্মা, ধূমকেতু ও বনলতা এক্সপ্রেস যমুনা নদীর ওপর দিয়ে (বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে) যাতায়াত করে।

উত্তর: রাতের বেলা ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্রেন হলো পদ্মা এক্সপ্রেস। এটি ঢাকা কমলাপুর স্টেশন থেকে প্রতিদিন রাত ১১:০০ টায় ছেড়ে যায় এবং পরদিন ভোরে রাজশাহী পৌঁছায়।

উত্তর: হ্যাঁ, যায়। বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে চলাচলকারী চারটি ট্রেনই (সিল্কসিটি, পদ্মা, ধূমকেতু এবং বনলতা এক্সপ্রেস) ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়। তবে পদ্মা সেতু হয়ে চলা মধুমতি এক্সপ্রেস বিমানবন্দর স্টেশনে যায় না।

উত্তর: রাজশাহী রুটে টিকিটের চাহিদা অনেক বেশি থাকায় টিকিট ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। কনফার্ম টিকিট পেতে আপনার ভ্রমণের ঠিক ১০ দিন আগে সকাল ৮:০০ টায় বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইট (eticket.railway.gov.bd) বা 'রেল সেবা' অ্যাপে লগ-ইন করে দ্রুত বুকিং করার চেষ্টা করুন।

আরো পড়ুন

Scroll to Top