ঢাকা থেকে খুলনা ট্রেনের সময়সূচী, ভাড়া ও অনলাইনে টিকিট কাটার সহজ নিয়ম: আপনার পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ গাইড!

খুলনা—বিভাগীয় শহর, শিল্পনগরী এবং বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার। ব্যবসার প্রয়োজনে হোক কিংবা সুন্দরবনের হরিণ আর রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখার নেশায়, প্রতিবছর ঢাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ খুলনায় যাতায়াত করেন। দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য ট্রেনই হলো সবচেয়ে আরামদায়ক, নিরাপদ এবং উপভোগ্য মাধ্যম। বিশেষ করে পদ্মা সেতু হওয়ার পর দক্ষিণবঙ্গের রেল যোগাযোগে এসেছে এক নতুন বিপ্লব।

আপনি কি প্রথমবার ঢাকা থেকে খুলনা যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন? ট্রেনের সময়সূচী কিংবা অনলাইনে ( Dhaka To Khulna Train Ticket and Schedule ) টিকেট কাটার পদ্ধতি নিয়ে ভাবছেন? চিন্তা নেই! আজকের এই ব্লগে আমরা ট্রেনের সময়, ভাড়া, টিকিট কাটার নিয়ম এবং খুলনার দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো। যারা প্রযুক্তিতে কিছুটা কাঁচা, তাদের জন্য প্রতিটি ধাপ আমরা সহজভাবে বুঝিয়ে দিয়েছি।

কেন ঢাকা থেকে খুলনা ভ্রমণে ট্রেন বেছে নেবেন?

ঢাকা থেকে খুলনার দূরত্ব সড়কপথে বেশ দীর্ঘ। বাসে যেতে গেলে অনেক সময় ক্লান্তি অনুভূত হয়। কিন্তু ট্রেনের যাত্রা:

  • আরামদায়ক আসন: দীর্ঘ যাত্রায় ট্রেনের প্রশস্ত সিটে বসে বা শুয়ে ভ্রমণ করা যায়।
  • নিরাপদ ভ্রমণ: সড়কপথের তুলনায় ট্রেনে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক কম।
  • জ্যামমুক্ত যাত্রা: রাস্তায় যানজটের কোনো চিন্তা নেই, তাই নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়।
  • পদ্মা সেতুর সৌন্দর্য: ট্রেনের জানলা দিয়ে বিশাল পদ্মা নদী পার হওয়ার দৃশ্য এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ তৈরি করে।

ঢাকা থেকে খুলনা ট্রেনের সময়সূচী ও ছুটির দিন

ঢাকা (কমলাপুর) থেকে খুলনা রুটে বেশ কিছু আন্তঃনগর এবং এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল করে। আপনার সময় অনুযায়ী নিচের টেবিল থেকে ট্রেন বেছে নিতে পারেন:

ঢাকা টু চট্টগ্রাম ট্রেনের সময়সূচী:
ট্রেনের নাম ট্রেন নং ঢাকা থেকে ছাড়ার সময় খুলনা পৌঁছানোর সময় সাপ্তাহিক ছুটি
সুন্দরবন এক্সপ্রেস ৭২৬ সকাল ০৮:০০ মিনিট বিকেল ০৩:৪০ মিনিট বুধবার
চিত্রা এক্সপ্রেস ৭৬৪ সন্ধ্যা ০৭:৩০ মিনিট ভোর ০৪:৪০ মিনিট রবিবার
জাহানাবাদ এক্সপ্রেস ৮২৬ রাত ০৮:৩০ মিনিট রাত ১১:৪৫ মিনিট সোমবার

মনে রাখবেন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনবোধে সময় পরিবর্তন করতে পারে, তাই যাত্রার আগে অবশ্যই রেল সেবা অ্যাপ বা স্টেশনে খোঁজ নিন।

খুলনা টু ঢাকা ট্রেনের সময়সূচী:
ট্রেনের নাম ট্রেন নং খুলনা থেকে ছাড়ার সময় ঢাকা পৌঁছানোর সময় সাপ্তাহিক ছুটি
সুন্দরবন এক্সপ্রেস ৭২৫ রাত ০৯:৪৫ মিনিট ভোর ০৫:১০ মিনিট বুধবার
চিত্রা এক্সপ্রেস ৭৬৩ সকাল ০৯:৩০ মিনিট সন্ধ্যা ০৬:০৫ মিনিট রবিবার
জাহানাবাদ এক্সপ্রেস ৮২৫ সকাল ০৬:০০ মিনিট সকাল ০৯:৪৫ মিনিট সোমবার

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ট্রেনের টিকিটের ভাড়া (Fare List)

আপনার বাজেট এবং পছন্দের সিটের ধরন অনুযায়ী ট্রেনের ভাড়ার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

আসন শ্রেণী ভাড়া
স্নিগ্ধা এসি সিট ( SNIGDHA ) ১২০৮ এবং ৮৫১ টাকা
শোভন ( SHOVAN ) ৬৩০ এবং ৪৪৫ টাকা
এসি সিট ১৪৪৯ এবং ১০১৮ টাকা
এসি কেবিন বাথ ( AC-B ) ২১৫১ টাকা

দ্রষ্টব্য: ভাড়ার হার যেকোনো সময় বাংলাদেশ রেলওয়ে পরিবর্তন করতে পারে।

অনলাইনে ট্রেন টিকেট কাটার নিয়ম (Dhaka to Khulna Train Ticket and Schedule)

ট্রেন ট্র্যাকিং পদ্ধতি

আপনার কাঙ্ক্ষিত ট্রেনটি বর্তমানে কোথায় আছে তা জানতে ট্রেন ট্র্যাকিং করা খুবই জরুরি। ট্র্যাকিং করতে আপনার ফোনের মেসেজ অপশনে গিয়ে লিখুন:
TR <Space> Train Number (যেমন: TR 813) এবং পাঠিয়ে দিন ১৬৩১৮ নাম্বারে। ফিরতি মেসেজে আপনি ট্রেনের বর্তমান অবস্থান ও সময় জানতে পারবেন।

খুলনা ও এর আশেপাশে দর্শনীয় স্থানসমূহ (Sightseeing in Khulna )

খুলনা শহর এবং এর আশেপাশের জেলাগুলোতে রয়েছে চমৎকার সব পর্যটন কেন্দ্র। খুলনা পৌঁছে আপনি যেসব জায়গা ঘুরে দেখতে পারেন:

  • সুন্দরবন: খুলনার প্রধান আকর্ষণ। করমজল, হারবাড়িয়া বা কটকা—যেকোনো পয়েন্ট থেকে বনের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
  • ষাট গম্বুজ মসজিদ: খুলনা থেকে মাত্র এক ঘণ্টার পথ বাগেরহাটে অবস্থিত এই ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটটি আপনাকে মুগ্ধ করবে।
  • খান জাহান আলী সেতু (রূপসা সেতু): বিকেলের সময় কাটানোর জন্য এটি একটি চমৎকার জায়গা। নদীর পাড় আর ব্রিজের ওপর থেকে সূর্যাস্ত দেখার মজাই আলাদা।
  • শহীদ হাদিস পার্ক: খুলনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই পার্কে একটি বড় মিনার এবং লেক রয়েছে।
  • খুলনা সিটি জু এবং বোটানিক্যাল গার্ডেন: পরিবার ও শিশুদের নিয়ে সময় কাটানোর জন্য এটি আদর্শ জায়গা।

যাত্রীদের জন্য জরুরি কিছু টিপস

  • অগ্রিম টিকিট: ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে টিকিটের চাহিদা অনেক বেশি থাকে। তাই যাত্রার ১০ দিন আগেই টিকিট কেটে রাখা নিরাপদ।
  • আইডি কার্ড সাথে রাখুন: রেলওয়ের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, টিকিট যার নামে কাটা হয়েছে, তার এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধনের ফটোকপি বা ডিজিটাল কপি সাথে রাখা জরুরি।
  • স্টেশনে উপস্থিতি: ট্রেন ছাড়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশনে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন।
  • সতর্কতা: ট্রেনের ভেতরে জানলার পাশে বসার সময় মোবাইল বা মূল্যবান জিনিসের প্রতি খেয়াল রাখুন।

স্ট্যান্ডিং টিকিট বা আসনবিহীন টিকিট

যদি কোনো কারণে সিট টিকেট না পান, তবে ট্রেন ছাড়ার অল্প সময় আগে স্টেশন কাউন্টার থেকে স্ট্যান্ডিং টিকিট সংগ্রহ করা যায়। সাধারণত মোট আসনের ২৫% স্ট্যান্ডিং টিকিট ইস্যু করা হয়। তবে দীর্ঘ যাত্রায় দাঁড়িয়ে যাওয়াটা বেশ কষ্টসাধ্য হতে পারে।

টিকিট রিফান্ড পলিসি

  • যাত্রা শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে ফেরত দিলে সার্ভিস চার্জ বাদে বাকি টাকা পাবেন।
  • ৪৮ ঘণ্টার কম কিন্তু ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় থাকলে ২৫% টাকা কাটা হবে।
  • ২৪ ঘণ্টার কম কিন্তু ১২ ঘণ্টার বেশি সময় থাকলে ৫০% টাকা কাটা হবে।
  • ০৬ ঘণ্টার কম সময় থাকলে কোনো টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না।

রেলওয়ের প্রয়োজনীয় ফোন নাম্বার

জরুরি প্রয়োজনে নিচের নাম্বারগুলোতে যোগাযোগ করতে পারেন:

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন
ফোন: ০২-৯৩৫৮৬৩৪
মোবাইলঃ ০১৭১১৬৯১৬১২

পার্সেল ও লাগেজ বুকিং

আপনি যদি বড় কোনো মালামাল বা পার্সেল সাথে নিতে চান, তবে ট্রেনের পার্সেল ভ্যানে তা বুকিং করতে পারেন। এর জন্য আলাদা চার্জ প্রযোজ্য। প্রতিটি টিকেটের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ ওজনের লাগেজ বিনামূল্যে বহন করা যায়, তবে অতিরিক্ত ওজনের জন্য বুকিং আবশ্যক।

ঢাকা থেকে খুলনা ট্রেনের সময়সূচী ও টিকিট সংক্রান্ত FAQ

উত্তর: ঢাকা থেকে খুলনা যাওয়ার জন্য দুটি প্রধান আন্তঃনগর ট্রেন রয়েছে। সেগুলো হলো— সুন্দরবন এক্সপ্রেস (৭২৬) এবং চিত্রা এক্সপ্রেস (৭৬৪)। এছাড়া বেনাপোল এক্সপ্রেসও এই রুটের যাত্রীদের জন্য একটি বিকল্প মাধ্যম।

উত্তর: ঢাকা কমলাপুর স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ার বর্তমান সময়সূচী হলো:

  • সুন্দরবন এক্সপ্রেস: প্রতিদিন সকাল ০৮:১৫ মিনিটে (পদ্মা সেতু হয়ে)।
  • চিত্রা এক্সপ্রেস: প্রতিদিন সন্ধ্যা ০৭:০০ মিনিটে (যমুনা সেতু হয়ে)।

উত্তর: বর্তমানে সুন্দরবন এক্সপ্রেস পদ্মা সেতু হয়ে চলায় সময় অনেক কমে এসেছে। ঢাকা থেকে খুলনা পৌঁছাতে এখন মাত্র ৬ ঘণ্টা থেকে ৭ ঘণ্টা সময় লাগে। অন্যদিকে যমুনা সেতু হয়ে চিত্রা এক্সপ্রেসে লাগে প্রায় ৯ ঘণ্টা।

আরো পড়ুন

Scroll to Top