ঢাকা থেকে কক্সবাজার ট্রেনের সময়সূচী, ভাড়া ও বিস্তারিত ভ্রমণ গাইড

বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার ভ্রমণের জন্য ট্রেন ভ্রমণ এখন আর স্বপ্ন নয়, বরং এক রোমাঞ্চকর বাস্তবতা। ট্রেনে ভ্রমণ মানেই নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। বিশাল সাগরের নীল জলরাশি আর পাহাড়ের মিতালি দেখতে আগে শুধু বাস বা বিমানই ছিল ভরসা, কিন্তু এখন যুক্ত হয়েছে সরাসরি ট্রেন সার্ভিস। ঝকঝক শব্দে ট্রেনের জানালা দিয়ে বাংলার প্রকৃতি দেখতে দেখতে কক্সবাজার পৌঁছানোর আনন্দই আলাদা।

আপনি কি নিয়মিত ট্রেনে ভ্রমণ করেন? অথবা প্রিয়জনদের নিয়ে প্রথমবার ট্রেনে কক্সবাজার যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন? তাহলে আজকের এই ব্লগটি আপনার জন্য। এই আর্টিকেলে আমরা Dhaka to Cox’s bazar Train Ticket, ট্রেনের সময়সূচী, ভাড়া এবং প্রয়োজনীয় সব টিপস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

২০২৩ সালের শেষ দিকে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে সরাসরি ট্রেন চালু হওয়া বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে ঝিনুকের মতো দেখতে আইকনিক কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশনটি পর্যটকদের মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এই রুটে বেশ কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেন নিয়মিত চলাচল করছে যা যাত্রীদের আরামদায়ক এবং সাশ্রয়ী ভ্রমণের সুযোগ করে দিচ্ছে।

ঢাকা টু কক্সবাজার ট্রেনের তালিকা ও সময়সূচী

ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজার যাওয়ার জন্য বর্তমানে জনপ্রিয় দুটি ট্রেন হলো কক্সবাজার এক্সপ্রেস এবং পর্যটক এক্সপ্রেস। বর্তমানে এই রুটে এই দুটি ইন্টারসিটি দ্রুত নিরাপদ এবং আধুনিক সুবিধা সমৃদ্ধ। নিচে এই ট্রেনগুলোর বিস্তারিত সময়সূচী দেওয়া হলো:

ট্রেনের সময়সূচী টেবিল:
ট্রেনের নাম ট্রেন নং ছাড়ার সময় (স্থান) পৌঁছানোর সময় (স্থান) সাপ্তাহিক ছুটি
কক্সবাজার এক্সপ্রেস ৮১৩ রাত ১১:০০ (ঢাকা) সকাল ০৭:২০ (কক্সবাজার) সোমবার
কক্সবাজার এক্সপ্রেস ৮১৪ দুপুর ১২:৩০ (কক্সবাজার) রাত ০৯:০০ (ঢাকা) সোমবার
পর্যটক এক্সপ্রেস ৮১৫ রাত ০৭:৪৫ (কক্সবাজার) ভোর ০৪:২০ (ঢাকা) বুধবার
পর্যটক এক্সপ্রেস ৮১৬ ভোর ০৬:১৫ (ঢাকা) দুপুর ০২:৪০ (কক্সবাজার) বুধবার

মনে রাখবেন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনবোধে সময় পরিবর্তন করতে পারে, তাই যাত্রার আগে অবশ্যই রেল সেবা অ্যাপ বা স্টেশনে খোঁজ নিন।

মেইল ও লোকাল ট্রেনের সময়সূচী

বর্তমানে ঢাকা থেকে কক্সবাজার রুটে কোনো সরাসরি মেইল বা লোকাল ট্রেন চলাচল করছে না। ভবিষ্যতে এই রুটে লোকাল সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে যারা একটু কম খরচে কক্সবাজার ভ্রমণ করতে চান, তারা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত মেইল ট্রেনে (যেমন: কর্ণফুলী এক্সপ্রেস বা চট্টলা এক্সপ্রেস) গিয়ে সেখান থেকে লোকাল বাস বা ট্রেনে কক্সবাজার যেতে পারেন। তবে সরাসরি ভ্রমণের জন্য আন্তঃনগর (Intercity) ট্রেনগুলোই সবচেয়ে আরামদায়ক।

ঢাকা টু কক্সবাজার ট্রেনের ভাড়ার তালিকা

ট্রেনের ভাড়া সিটের ক্যাটাগরির ওপর নির্ভর করে। নিচে প্রধান ক্যাটাগরিগুলোর ভাড়ার তালিকা দেওয়া হলো ( ভ্যাট ও অন্যান্য চার্জসহ কম-বেশি হতে পারে ):

আসন শ্রেণী ভাড়া
শোভন চেয়ার ৭৫৪ টাকা
স্নিগ্ধা ( এসি সিট ) ১,৪৪৩ টাকা
এসি বার্থ ২,৬৪৪ টাকা
এসি সিট (কেবিন) ১,৭২৮ টাকা

ভ্রমণের ধরন অনুযায়ী আপনি আপনার বাজেট অনুযায়ী আসন নির্বাচন করতে পারেন। রেলসেবা অ্যাপ বা অনলাইন থেকে টিকিট বুকিং দিলে উপরে উল্লখিত ভাড়ার সাথে ২০ টাকা সার্ভিস চার্জ যুক্ত হবে। AC_B/F_BERTH এই শ্রেণীর টিকিতের সাথে ৫০ টাকা বেডিং চার্জ যুক্ত হবে।

যাত্রা পথে স্টপেজ বা বিরতি

ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে ট্রেনগুলো সব স্টেশনে থামে না। সাধারণত এই বিরতিগুলো দেওয়া হয়:

  1. ঢাকা (কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন)
  2. ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশন
  3. চট্টগ্রাম স্টেশন (ইঞ্জিন রিভার্স বা পানি নেওয়ার জন্য বিরতি)
  4. কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন

অনলাইনে ট্রেন টিকেট কাটার নিয়ম (Dhaka to Cox’s bazar Train Ticket)

ট্রেন ট্র্যাকিং পদ্ধতি

আপনার কাঙ্ক্ষিত ট্রেনটি বর্তমানে কোথায় আছে তা জানতে ট্রেন ট্র্যাকিং করা খুবই জরুরি। ট্র্যাকিং করতে আপনার ফোনের মেসেজ অপশনে গিয়ে লিখুন:
TR <Space> Train Number (যেমন: TR 813) এবং পাঠিয়ে দিন ১৬৩১৮ নাম্বারে। ফিরতি মেসেজে আপনি ট্রেনের বর্তমান অবস্থান ও সময় জানতে পারবেন।

কক্সবাজারের দর্শনীয় স্থানসমূহ

ট্রেন থেকে নেমে যখন আপনি ঝিনুক আকৃতির আইকনিক স্টেশনে পৌঁছাবেন, তখন থেকেই আপনার ভ্রমণ আনন্দ শুরু হবে। কক্সবাজারে ভ্রমণের জন্য জনপ্রিয় কিছু জায়গা হলো:

  • লাবণী পয়েন্ট ও সুগন্ধা বিচ: শহরের মূল সমুদ্র সৈকত।
  • ইনানী ও পাটুয়ারটেক বিচ: স্বচ্ছ পানি ও পাথুরে সৈকতের জন্য বিখ্যাত। হালকা সেন্টমার্টিন ফ্লেভার পাবেন।
  • মেরিন ড্রাইভ: একদিকে পাহাড় আর অন্যদিকে সমুদ্রের মোহনীয় রাস্তা।
  • হিমছড়ি ঝরনা: পাহাড়ের উপর থেকে সমুদ্র দেখার চমৎকার সুযোগ।
  • মহেশখালী, সোনাদিয়া ও সেন্টমার্টিন: হাতে সময় থাকলে ট্রলারে বা শিপে ঘুরে আসতে পারেন।

যাত্রীদের জন্য জরুরি কিছু টিপস

আগে টিকেট কাটা: কক্সবাজার রুটে টিকেটের চাহিদা অনেক বেশি, তাই ভ্রমণের ১০-১৫ দিন আগেই টিকেট কেটে রাখুন।

  • লাগেজ: অতিরিক্ত লাগেজ বহন না করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রই সঙ্গে রাখুন।
  • খাবার ও পানি: ট্রেনে খাবার পাওয়া যায় তারপরও নিজস্ব পানির বোতল এবং শুকনো খাবার সাথে রাখুন।
  • নিরাপত্তা: ট্রেনে আপনার মালামাল ও মোবাইলের দিকে খেয়াল রাখুন। অপরিচিত কারো দেওয়া কিছু খাবেন না।
  • সময় জ্ঞান: ট্রেন ছাড়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে স্টেশনে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন।
  • পরিচ্ছন্নতা: ট্রেনের ভেতরে বা রেলওয়ে স্টেশনে ময়লা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবেন না।

স্ট্যান্ডিং টিকিট বা আসনবিহীন টিকিট

যদি কোনো কারণে সিট টিকেট না পান, তবে ট্রেন ছাড়ার অল্প সময় আগে স্টেশন কাউন্টার থেকে স্ট্যান্ডিং টিকিট সংগ্রহ করা যায়। সাধারণত মোট আসনের ২৫% স্ট্যান্ডিং টিকিট ইস্যু করা হয়। তবে দীর্ঘ যাত্রায় দাঁড়িয়ে যাওয়াটা বেশ কষ্টসাধ্য হতে পারে।

টিকিট রিফান্ড পলিসি

  • যাত্রা শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে ফেরত দিলে সার্ভিস চার্জ বাদে বাকি টাকা পাবেন।
  • ৪৮ ঘণ্টার কম কিন্তু ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় থাকলে ২৫% টাকা কাটা হবে।
  • ২৪ ঘণ্টার কম কিন্তু ১২ ঘণ্টার বেশি সময় থাকলে ৫০% টাকা কাটা হবে।
  • ০৬ ঘণ্টার কম সময় থাকলে কোনো টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না।

রেলওয়ের প্রয়োজনীয় ফোন নাম্বার

জরুরি প্রয়োজনে নিচের নাম্বারগুলোতে যোগাযোগ করতে পারেন:

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন
ফোন: ০২-৯৩৫৮৬৩৪
মোবাইলঃ ০১৭১১৬৯১৬১২
কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন:
রেলওয়ে হেল্পলাইন: ১৩১
ওয়েবসাইটঃ Click Here

পার্সেল ও লাগেজ বুকিং

আপনি যদি বড় কোনো মালামাল বা পার্সেল সাথে নিতে চান, তবে ট্রেনের পার্সেল ভ্যানে তা বুকিং করতে পারেন। এর জন্য আলাদা চার্জ প্রযোজ্য। প্রতিটি টিকেটের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ ওজনের লাগেজ বিনামূল্যে বহন করা যায়, তবে অতিরিক্ত ওজনের জন্য বুকিং আবশ্যক।

ট্রেনে ঢাকা থেকে কক্সবাজার ভ্রমণ কেবল সাশ্রয়ী নয়, এটি অত্যন্ত আনন্দদায়ক। যানজটমুক্ত ভ্রমণ আর আধুনিক ট্রেনের সুযোগ-সুবিধা আপনার ট্যুরকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে। আশা করি, আজকের এই ব্লগের মাধ্যমে আপনি Dhaka to Cox’s bazar Train Ticket এবং সময়সূচী সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেয়েছেন। আপনার পরবর্তী কক্সবাজার ভ্রমণ নিরাপদ ও আনন্দময় হোক।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

উত্তরঃ সাধারণত ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা সময় লাগে।

উত্তরঃ ৫ বছরের নিচে বাচ্চাদের জন্য টিকেটের প্রয়োজন হয় না, তবে তাদের জন্য আলাদা আসন বরাদ্দ থাকবে না।

উত্তরঃ না, কক্সবাজার এক্সপ্রেসের সাপ্তাহিক ছুটি সোমবার এবং পর্যটক এক্সপ্রেসের ছুটি বুধবার।

উত্তর: এটি কক্সবাজার শহরের চান্দের পাড়া এলাকায় অবস্থিত, যা মূল শহর থেকে সামান্য দূরে।

উত্তরঃ সাধারণত ১০ দিন আগে থেকে অনলাইনে টিকেট কেনা যায়।

উত্তর: হ্যাঁ, অফিসিয়াল সাইট সম্পূর্ণ নিরাপদ।

উত্তর: হ্যাঁ, ট্রেনে খাবারের ক্যান্টিন বা খাবার বিক্রেতারা থাকেন। তবে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী শুকনো খাবার এবং পানি সাথে রাখা ভালো।

উত্তর: না, আপনার মোবাইলে থাকা ডিজিটাল কপি বা পিডিএফ দেখালেই হবে। তবে আপনি চাইলে স্টেশনের কাউন্টার থেকে টিকিটটি প্রিন্ট করে নিতে পারেন।

উত্তরঃ যদি কোন কারণে ট্রেনের শিডিউল পরিবর্তন হয় তাহলে আপনার ফোনে এই পরিবর্তনের একটি বার্তা চলে আসবে।

আরো পড়ুন

Scroll to Top